কামরুল ইসলাম
৩ মার্চ ২০২৬, ২:৫০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

এক প্রতিষ্ঠানের ৬৩ শিক্ষকের ৫৭ জনই ‘অবৈধ’

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জাল সনদের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সনদ যাচাই অভিযানে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার একটি প্রতিষ্ঠানে তদন্ত চালিয়ে দেখা গেছে, কর্মরত ৬৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ জনের সনদই প্রাথমিকভাবে জাল বলে শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম আপাতত গোপন রাখা হয়েছে।ডিআইএ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই পদ্ধতিতে সনদ যাচাই করা হচ্ছে—সরাসরি তথ্য যাচাই এবং কিউআর কোড স্ক্যানিং। সন্দেহজনক মনে হলে সংশ্লিষ্ট বোর্ড বা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়। জাল প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বেতন বন্ধসহ অবৈধভাবে নেওয়া সরকারি টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।তাদের সূত্র মতে, প্রথম ধাপে ১৭৭২ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর বাইরে গত এক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৩৩০ জন এবং মাদরাসা শিক্ষায় ১৩৬ জনসহ মোট ৪৬৬ জনের জাল সনদ নতুন করে শনাক্ত হয়েছে।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্ত চালিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কর্মরত ৬৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ জনেরই নিয়োগ অবৈধ এবং সনদ জাল। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষকই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।

 

শুধু জাল সনদই নয়, ভুয়া অভিজ্ঞতা এবং অনুমোদনহীন বিষয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগের মতো চাঞ্চল্যকর অনিয়মও ধরা পড়েছে, যা বর্তমানে প্রশাসনিক তদন্তাধীন রয়েছে।

তবে, প্রক্রিয়াটি জটিল বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, শনাক্তের পর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সেখান থেকেই আসে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সময় লাগে।

 

জালিয়াতির বহুমুখী রূপ

 

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।সেখানে ৬৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ জনের সনদ জাল বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বর্তমানে ঘটনাটি তদন্তাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামও প্রকাশ করা হচ্ছে না।

See also  আরেক মামলায় গ্রেফতার সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফরহাদের স্ত্রী মোনালিসা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিআইএ’র একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে অনেক কিছু শনাক্ত করেছি, কিন্তু সব তথ্য যাচাই করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বোর্ড ও অন্যান্য সংস্থার তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু ক্ষেত্রে শুধু জাল সনদ নয়, অবৈধ নিয়োগ, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ এবং অনুমোদনহীন বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনাও রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে একই ব্যক্তিকে একাধিক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) ডিজিটাল ও সরাসরি যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে গত ১৮ মাসে প্রায় ৫০০ নতুন জাল সনদ শনাক্ত করেছে। এর আগে প্রথম ধাপে ১৭৭২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। জালিয়াতি রোধে বর্তমানে কিউআর কোড স্ক্যানিং এবং সরাসরি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড থেকে তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে বেতন বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

 

ওই কর্মকর্তারা আরো বলেন, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসি (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) চালু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে, এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি জালিয়াতি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা এবং নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিআইএ’র আরেক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, আমরা চাই শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ অবস্থায় ফিরে আসুক। জাল সনদধারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। জাল সনদের উৎস চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ডিজিএফআই, এনএসআই ও ডিএসবি’র তৎপরতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

 

জানা গেছে, গত প্রায় এক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন প্রতিষ্ঠানে ৩৩০ জন এবং মাদ্রাসা খাতে আরও ১৩৬ জনসহ মোট ৪৬৬ জনের জাল সনদ শনাক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তবে, জনবল সংকট ও ফাইলজটের কারণে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। অনেক ক্ষেত্রে একের পর এক ফাইল জমা হলেও তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।

See also  গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

জাল সনদধারী শনাক্ত হলেও জনবল সংকট, ফাইলজট এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরতার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ডিআইএ কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (ডিজিএফআই, এনএসআই ও ডিএসবি) সক্রিয় হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। অনিয়ম ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত ও কার্যকর আইনি কাঠামো চালুর প্রস্তাবও সংশ্লিষ্ট মহলে পেশ করা হয়েছে।

 

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

 

সার্বিক বিষয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জাল সনদ শনাক্তে আমরা নিয়মিতভাবে কাজ করছি এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অনিয়ম আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে সামনে আসছে। আমাদের কাছে যেসব সনদ সন্দেহজনক মনে হয়, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। লিখিতভাবে জাল প্রমাণিত হলেই আমরা তা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরবর্তী ধাপে পাঠাই।’

 

‘অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তা প্রকাশ করা যায় না। কারণ, একটি সনদ বা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক সংস্থার যাচাই প্রয়োজন হয়। এছাড়া কিছু ঘটনায় শুধু জাল সনদ নয়, অবৈধ নিয়োগ, ভুয়া অভিজ্ঞতা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে পদ সৃষ্টির মতো বিষয়ও পাওয়া যাচ্ছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।’

 

আমরা চাই প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া চালু হোক। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিক্ষা খাতে এই অনিয়ম অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

 

পরিচালক আরো বলেন, আমরা চাই প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া চালু হোক। বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিক্ষা খাতে এই অনিয়ম অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সন্ধ্যার মধ্যে যেসব জেলায় ঝড়ের আভাস

ছাত্রনেতা থেকে ‘মহামান্য’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণিত অলিম্পিয়াড বিজয়ীদের সৌজন্য সাক্ষাৎ

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

তিন বছরের মধ্যে আরও ৩ এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অ্যানি, স্থানীয় সরকারে সালাহউদ্দিন

রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুলের প্রস্তাবক ও সমর্থক কারা?

হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা নেই: ইয়েমেন

হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’, দাবি ট্রাম্পের

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগ, গহীন পাহাড়ে আবারও বাজবে—‘স্কুলঘণ্টা’

১০

আরেক মামলায় গ্রেফতার সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফরহাদের স্ত্রী মোনালিসা

১১

গোলাম রাব্বানীর ভাই রুহানী যে কারণে পুলিশের চাকরি হারালেন

১২

হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর প্রাণহানি

১৩

যে কয়টারে পার, উঠায়া নিয়া যাও: শেখ হাসিনা

১৪

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিসার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ

১৫

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি সভা আজ

১৬

টাঙ্গাইল রেলস্টেশনে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের জোর দাবি

১৭

ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের ৫৫ জনই পেলেন জিপিএ-৫

১৮

২২৬টি মাদ্রাসার কেউই পাস করতে পারেনি

১৯

এসএসসি-সমমানে পাসের হারে শীর্ষে ঢাকা, ৭১.৬৩ শতাংশ

২০

Design & Developed by: BD IT HOST