থানার এসি-টিভি খুলে বাসায় নিলেন ওসি’-শিরোনামে ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই দিন অন্য একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল-‘বদলির আদেশ পাওয়ার পর থানার এসি-টেলিভিশন খুলে নিলেন ওসি।’ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক বা নিউজ পোর্টালসহ প্রায় সব গণমাধ্যমেই খবরটি জায়গা করে নেয়।
যাকে নিয়ে এসব সংবাদ তিনি ছিলেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। থানা থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা সেট নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। অভিযোগ ওঠার পর ভূঞাপুর থানা থেকে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয় তাকে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী সেই ফরিদুল এখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানার ওসি।ফরিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ভূঞাপুর থানা থেকে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার খবরটি ওই সময় মিডিয়ায় অতিরঞ্জিতভাবে ছাপা হয়েছিল। তিনি নিজেকে বঞ্চিতও দাবি করেন।
শুধু ফরিদুল ইসলাম একা নন; আওয়ামী আমলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তারা ফের বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যাদের ঢাকা থেকে দূরবর্তী স্টেশনে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল, তাদের পদায়ন দেওয়া হচ্ছে ঢাকায়। পুলিশের উচ্চপর্যায়কে ম্যানেজ করেই এসব পদায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের পদায়নের মাধ্যমে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে গোটা পুলিশ প্রশাসনের। প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে।
অপরদিকে আওয়ামী শাসনামলে বঞ্চনার শিকার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, পদায়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিতদের উপেক্ষা করে হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষের দিকে পুলিশ চরম ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হচ্ছে, তাতে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে।
দুটি হত্যা মামলার আসামি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ৫ মে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসাবে পদায়ন করা হয়। পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন তিনি। ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মাহবুবের কর্মকাণ্ড সামনে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে জেলার শিবগঞ্জ থানার যুবদল নেতা মিজান হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মিজান। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আইনাল হক ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার ১০ নম্বর আসামি মাহবুব আলম খান। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে আরও একজন ভুক্তভোগী বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় অপর হত্যা মামলাটি করেন। ওই মামলায় ১২ জন আসামির মধ্যে মাহবুব আলম খানের নাম ৩ নম্বরে।
মাহবুব আলম খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে দুটি হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে আসামি করা হয়। আমি আশা করছি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ থেকে রেহাই পাব। ফেনী জেলায় কবে যোগদান করবেন-জানতে চাইলে বলেন, ‘আইজিপি মহোদয় যেদিন বলবেন, সেদিন।’
নুরুল মুত্তাকিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডেমরা, ভাটারা, তুরাগ এবং লালবাগ থানার ওসি হিসাবে। পদোন্নতি পেয়ে ডিএমপির সহকারী কমিশনার (এসি) হিসাবেও কাজ করেন একাধিক স্থানে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তাকে এপিবিএনে বদলি করা হয়। ৯ মার্চ তাকে এপিবিএন থেকে পদায়ন করা হয় ডিএমপিতে। এখন তিনি এসি (প্যাট্রোল) হিসাবে মোহাম্মদপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কর্মরত।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST