স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বলিষ্ঠ হয়নি।
সরকার বদলায়, নীতিমালা বদলায়, নতুন কারিকুলাম আসে—কিন্তু শিক্ষার মৌলিক চাহিদা ও শিশুদের প্রকৃত বিকাশ বদলায় না।
প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আমার সন্তান দেখাচ্ছে, সে বই মুখস্থ করছে, কোচিং করছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে—কিন্তু শেখার আনন্দ, চিন্তাশীল হওয়ার সুযোগ, আত্মনির্ভর হওয়ার পরিবেশ তার কাছে অনুপলব্ধ।
এটাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর ঘাটতি।
২০২৫ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার যথাক্রমে ৮৬% ও ৮১%, যা সংখ্যার দিক থেকে প্রাসঙ্গিকভাবে প্রশংসনীয়।
কিন্তু সংখ্যা বলে সবকিছু না।
অনেক শিক্ষার্থী A+ পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় মৌলিক বিষয়ে টিকতে পারছে না।
এটি প্রমাণ করে—শিক্ষা আজ পরীক্ষার নম্বর নির্ভর, জ্ঞান ও দক্ষতা নির্ভর নয়।
সংখ্যার উচ্ছ্বাসের পেছনে লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীর কর্মক্ষমতার অভাব।
শিক্ষকরা প্রায়শই প্রশিক্ষণহীন, কম বেতনে অবমূল্যায়িত, ক্লান্ত।
গ্রামের শিশু ভাঙা বেঞ্চে, শহরের শিশু ডিজিটাল ক্লাসে — এ বৈষম্য শিক্ষার মূল ক্ষত।
নতুন কারিকুলাম আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তব প্রয়োগে বাধা, যেমন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও স্কুল অবকাঠামোর অভাব, এখনও বিদ্যমান।
শিক্ষক যদি অনুপ্রেরণা না পান, শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও মননশীলতা বিকশিত হবে না।
শিক্ষা সরকারের একক দায়িত্ব নয়।
অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় কমিটি, এনজিও—সবাইকে যুক্ত করতে হবে।
শিশুদের জীবনদক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা, আত্মনির্ভরতা শেখানো শুরু করতে হবে প্রাথমিক স্তর থেকেই।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যেমন অটিজম বা ADHD, তাদের জন্য early intervention এবং ধারাবাহিক শিক্ষা অপরিহার্য।
করোনা বা অন্যান্য বিরতির মতো পরিস্থিতি শিশুদের বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে, যা শুধুমাত্র শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব।
শহর বনাম গ্রাম, ধনী বনাম দরিদ্র, সরকারি বনাম বেসরকারি—সবখানেই বৈষম্য বেড়েছে।
শুধু সরকারি স্কুলের শিশুদের ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় এটি আরও গভীর হচ্ছে।
এ বৈষম্য শিক্ষার্থীর বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
সুতরাং শিক্ষার মান উন্নয়নের সঙ্গে সমতা এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষার পরিবর্তন শুধুমাত্র কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে।
প্রাথমিক স্তর থেকে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণে বড় বিনিয়োগ, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, অভিভাবক ও কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ—এসবই এখন অপরিহার্য।
নতুন প্রাথমিক উন্নয়ন কর্মসূচি PEDP-5 বড় সুযোগ হলেও, পূর্ববর্তী কর্মসূচি PEDP-4-এর বাজেটের মাত্র ১৭% বাস্তবায়িত হয়েছে, যা প্রমাণ করে পরিকল্পনা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।
—
সরকার বদলায়, মুখের বুলি বদলায়—কিন্তু শিক্ষার অবহেলা বদলায় না।
আমাদের সন্তানরা শুধুই পরীক্ষার নম্বর নয়, ভালো মানুষ, চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক—
এই লক্ষ্যেই শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ ও পরিবার একসাথে কাজ করা প্রয়োজন।
> “ভালো ফলাফল নয়, ভালো মানুষ তৈরিই হোক শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য।”
লেখিকাঃমারজান আক্তার
মহাসচিব এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্পেইন
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST