অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, কৃষক-জনতার অকৃত্রিম নেতা এ কে ফজলুল হক—যিনি ইতিহাসে “শেরে বাংলা” নামে অমর—তার ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী (২৭ এপ্রিল ২০২৬)। ১৯৬২ সালের এই দিনে ঢাকায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবন, কর্ম ও দর্শন আজও বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছে।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শেরে বাংলা। তিনি শৈশব থেকেই মেধাবী ও মানবিক গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে তিনি আইন, রাজনীতি ও সমাজসেবায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। শেরে বাংলার রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩)। কলকাতা সিটি করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী, আইনসভার সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যান।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের অবদান উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন, কৃষকবান্ধব নীতি “লাঙ্গল যার জমি তার” বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন, ২১ দফা দাবির প্রণেতা, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন (রোল নাম্বার পদ্ধতি চালু)। তার এসব সিদ্ধান্ত তৎকালীন সমাজে বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন দ্বার উন্মোচন করে। শেরে বাংলা ছিলেন একজন অসাধারণ শিক্ষানুরাগী। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই জাতির মুক্তির প্রধান হাতিয়ার। উচ্চশিক্ষায় মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশে অবদান রাখেন। সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। গণমানুষের নেতা হিসেবে তাঁর দর্শন। শেরে বাংলার রাজনীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে জনগণকেন্দ্রিক। তার মূল দর্শন ছিল কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শিক্ষার প্রসার। তিনি প্রমাণ করে গেছেন রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এ বছরও তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ২৭ এপ্রিল ২০২৬ সকাল ৮টায় তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শেরে বাংলা মিউজিয়াম করার দাবিতে মানববন্ধন, ফাতেহা পাঠ ও দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা ও স্মরণসভা। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক গবেষণা পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে।
২৫ এপ্রিল ২০২৬ শনিবার বিবৃতিতে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক গবেষণা পরিষদের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও এনডিপির মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন—বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেরে বাংলাকে নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের একজন আলোকিত দেশপ্রেমিক ও সৎ রাজনীতিবিদ, যিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাজনীতি সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হতে পারে।
নেতৃবৃন্দ আরও উল্লেখ করেন “লাঙ্গল যার জমি তার” নীতির মাধ্যমে কৃষক সমাজ জমির মালিকানা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিল। শিক্ষাক্ষেত্রে রোল নাম্বার পদ্ধতি চালু করে তিনি বৈষম্য দূর করেন এবং মুসলমানদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের পথ সুগম করেন। শেরে বাংলা ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাদাতা নেতাদের একজন এবং স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা। যদিও স্বাধীন বাংলাদেশ তিনি দেখে যেতে পারেননি, তবুও তার আদর্শ ও সংগ্রাম স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST